05-May-2020 (GMT +6)
Author: পিন্টু রঞ্জন অর্ক

ফ্যাব ল্যাবের ফেস শিল্ড

করোনাযুদ্ধে ফেস শিল্ড জরুরি সুরক্ষা সামগ্রী, বিশেষ করে চিকিৎসকদের জন্য। সেই ফেস শিল্ড তৈরি হচ্ছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাব ল্যাবে। চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছেও গেছে অনেকগুলো। ল্যাবটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত ম. সোলায়মানের সঙ্গে কথা বলেছেন 

ফ্যাব ল্যাবের ফেস শিল্ড

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা কফের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ড্রপলেট (ক্ষুদ্র জলকণা) থেকে সুরক্ষা পেতে ফেস শিল্ডের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্বেই। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম।  এই সংকটকালে এগিয়ে এসেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক। তাঁরা কাজ করছেন স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে। এনামুল আরেফিন প্রধান গবেষক। তত্ত্বাবধান করছেন অধ্যাপক মো. সোলায়মান।

 

ল্যাবটি যেমন

ফ্যাবরিকেশন ল্যাবরেটরি বা ফ্যাব ল্যাব মূলত কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত একটি ডিজিটাল ওয়ার্কশপ। ফ্যাব ল্যাবের স্লোগান—ইউ ক্যান মেক অ্যানিথিং। বাংলাদেশ থেকে এমআইটিতে নিবন্ধিত প্রথম ফ্যাব ল্যাব এটি। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সারা দেশে আরো সাতটির সঙ্গে এটিও প্রতিষ্ঠা পায় ২০১৮ সালে।

সোলায়মান বলেন, আমাদের এখানে সেলাই মেশিন থেকে শুরু করে থ্রিডি প্রিন্টার, লেজার কাটার, সিএনসি রাউটার, ভিনাইল প্লটার, পিসিবি মেশিন, ওয়েলডিং সেকশন, মেটাল সেকশনসহ আরো অনেক কিছুই আছে। দেশে এখন ফ্যাব ল্যাব আমাদেরটাই খোলা আছে। এই ক্রান্তিকালে মনে হলো আমাদেরও কিছু করার আছে। তাই ফেস শিল্ড বানানোর উদ্যোগ নিয়েছি।

 

সুজন, ফিল্ডরেডি ও ব্র্যাক

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিকস ও প্লান্ট ব্রিডিংয়ে স্নাতকোত্তর এনামুল আরেফিন। দেশের প্রথম ও একমাত্র ফ্যাব গ্র্যাজুয়েটও তিনি। ফ্যাব একাডেমিতে তাঁর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন এমআইটির নেইল গারসেনফিল্ড। সোলায়মান বলছিলেন, লন্ডনভিত্তিক সংগঠন ফিল্ডরেডির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয় এ বছরের শুরুর দিকে। তারা আমাদের বেশ কিছু কারিগরি সমর্থনও দিয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের জন্য টয় সোপ বানিয়ে দেওয়ার পরামর্শ পেয়েছিলাম তাদের কাছ থেকে। এ কাজ করতে করতেই করোনা দিল হানা। সারা পৃথিবী স্বাস্থকর্মীদের সুরক্ষা পণ্য নিয়ে কাজ করতে লাগল। আমেরিকা, ভিয়েতনাম,  থাইল্যান্ডসহ আরো দেশে আইসিইউতে যাঁরা কাজ করেন, ‘তাঁদের ফেস শিল্ড পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমরাও পাশে দাঁড়াতে চাইলাম।’ ফিল্ডরেডি গগলস এবং ফেস শিল্ডের নকশা পাঠায় ড. সোলায়মানের কাছে। এর মধ্যে দেশে লকডাউন শুরু হয়ে যায়। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক শেকৃবি ফ্যাব ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা আগে থেকেই ফেস শিল্ড তৈরির ল্যাব খুঁজছিল। একপর্যায়ে ব্র্যাক সোশ্যাল ইনোভেশন ল্যাবের সঙ্গে অনলাইনে ফ্যাব ল্যাবের একটি চুক্তি হয়। স্থির হয়, ব্র্যাক প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করবে আর কারিগরি সুবিধা ও মেধাশ্রম দেবে ফ্যাব ল্যাব। শেকৃবি উপাচার্য কামাল উদ্দিন আহমেদও ভালো সমর্থন দিয়েছেন। তবে সবকিছু বন্ধ থাকায় উপকরণ সংগ্রহে ব্র্যাককে বেগ পেতে হয়েছে। যাহোক, উপকরণ ল্যাবে এসে পৌঁছায় এপ্রিলের গোড়ায়। কাজ শুরু করার পর ল্যাবই হয়ে উঠেছিল সুজনের ঘরবাড়ি। অনেক রাত নির্ঘুমও কাটিয়েছেন। ল্যাবে সুজনকে সহায়তা দিয়েছেন ড. আয়শা আক্তার আখি ও ড. কামরুন্নাহার নিঝুমও।

 

যেভাবে কাজ এগোল

ফেস শিল্ড বানিয়ে এনামুল নিজেই বারবার পরে ট্রায়াল দিয়েছেন। আরামদায়ক কি না দেখেছেন। কোনোটায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে আবার ঠিক করেছেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন আকৃতির চারটি শিল্ড চূড়ান্ত হয়। থ্রিডি প্রিন্টার ও লেজার কাটার ও সিএনসি মেশিন ব্যবহার করে বানানো এই ফেস শিল্ডগুলো আন্তর্জাতিক মানের এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য (ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ২০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে)। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ দেশের আরো কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা এক শর মতো ফেস শিল্ড নিয়েছেন। ড. সোলায়মান বললেন, ‘প্রথম দিকে তৈরি হওয়া শিল্ডগুলোর খরচ প্রায় সাড়ে চার শ টাকা। ডাক্তাররা বললেন, ‘কোয়ালিটি খুব ভালো। তবে খরচ কমাতে পারলে আরো ভালো হবে। তারপর আরেকটা নকশা করা হলো। তখন দাম পড়ল প্রায় তিন শ টাকা। তারপর আরেক দফা মডিফাই করে দাম ধরা হলো আড়াই শ টাকা।’ শিল্ডটির আরো মডিফিকেশন চলছে। আশা করা হচ্ছে ১৭০ টাকায় দেওয়া যাবে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে গাজীপুর, নরসিংদী, মাদারীপুরেও পৌঁছেছে এই শিল্ড। ব্র্যাক নিয়েছে এক হাজার শিল্ড। আরো এক হাজার নেবে। জার্মানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এমএসএফও এক হাজার ফেস শিল্ড নিতে চেয়েছে। আগামীতে কম খরচের মানসম্পন্ন ভেন্টিলেটর বানানোরও পরিকল্পনা করছে শেকৃবি ফ্যাব ল্যাব।